ঘোড়াটা পড়ে গিয়েছিল এক বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়, যখন তুলি বেড়ালের পেছনে ছুটছিল আর বেড়ালটা লাফ দিয়েছিল শোকেসের মাথায়। শব্দটা খুব জোরে হয়নি। পোড়ামাটি ভাঙলে কাচের মতো ঝনঝন করে না, একটা চাপা, শুকনো শব্দ হয়, যেন কেউ গলা খাঁকারি দিল। আমি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, মেঝেতে বাঁকুড়ার সেই লম্বা গলার ঘোড়া, আর তার থেকে হাত খানেক দূরে একটা ছোট্ট ত্রিকোণ টুকরো। বাঁ কানটা।
ঘোড়াটা ছিল মায়ের। বিষ্ণুপুরের মেলা থেকে কিনেছিলেন, আমার জন্মেরও আগে। আমাদের তিনবার বাড়ি বদল হয়েছে, দুবার শহর বদল, কিন্তু ঘোড়াটা প্রতিবার খবরের কাগজে মুড়ে, মায়ের শাড়ির ভাঁজে রেখে, সবার আগে নতুন বাড়িতে পৌঁছেছে। মা নেই আজ চার বছর। ঘোড়াটা ছিল।
তুলি কাঁদেনি। সেটাই ছিল চিন্তার। আট বছরের মেয়ে, যে পেনসিল হারালে পাড়া মাথায় তোলে, সে কানের টুকরোটা কুড়িয়ে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল, আর দুদিন প্রায় কথাই বলল না। রাতে দেখি, টুকরোটা তার বালিশের পাশে, রুমালে মোড়া।
শনিবার সকালে আমি বললাম, “চল, ঘোড়ার বাড়ি যাই।”
“ঘোড়ার আবার বাড়ি হয় নাকি?”
“হয়। পাঁচমুড়া। ওখানেই তো জন্ম ওদের।”
* * *
ভোরের ট্রেনে বিষ্ণুপুর, সেখান থেকে একটা অটো, তারপর লাল মাটির রাস্তা। শীতের শুরু, ধানকাটা মাঠে খড়ের আঁটি দাঁড়িয়ে আছে সারি দিয়ে, শালবনের মাথায় রোদ এসে পড়েছে নরম হয়ে। তুলি জানলার বাইরে মুখ বাড়িয়ে ছিল পুরো পথ, রুমালে মোড়া কানটা মুঠোয় ধরে।
পাঁচমুড়ায় ঢুকতেই মনে হলো, গ্রামটা আসলে একটা আস্তাবল। প্রতিটা উঠোনে ঘোড়া। কোনোটা কাঁচা, ধূসর আর ভেজা, রোদে শুকোচ্ছে মাথা উঁচু করে; কোনোটা সদ্য পোড়ানো, গায়ের রং গাঢ় লাল, যেন সন্ধ্যার আকাশ থেকে কেটে আনা। ছোট ঘোড়া, বড় ঘোড়া, একটা তো তুলির চেয়েও লম্বা। বাতাসে খড় আর শুকনো পাতা পোড়ার গন্ধ, তার নিচে ভেজা মাটির সেই গভীর, ঠান্ডা গন্ধ, যেটা বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার পরে ওঠে।
একটা উঠোনের দাওয়ায় বসে এক বৃদ্ধ চাকা ঘোরাচ্ছিলেন। খালি গা, কাঁধে একটা গামছা, আঙুলগুলো মাটিতে মাখামাখি। নাম জিজ্ঞেস করতে বললেন, নিতাই কুম্ভকার। পাশে বসে তাঁর নাতনি পুঁটি, তুলিরই বয়সি, একটা কাঁচা ঘোড়ার গায়ে কাঠি দিয়ে নকশা কাটছে।
তুলি কিছু না বলে রুমালটা খুলে বৃদ্ধের সামনে ধরল।
নিতাইবাবু কানটা দুই আঙুলে তুলে আলোর দিকে ঘুরিয়ে দেখলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “বাকি ঘোড়াটা কোথায়?”
“বাড়িতে,” তুলি বলল। “ঠাকুমার ঘোড়া। আমি ভেঙেছি।”
বৃদ্ধ খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। চাকাটা ধীরে ধীরে থেমে এল। তারপর বললেন, “এ কান তো আমাদের এদিকেরই হাতের কাজ। চল্লিশ বছর আগের তো হবেই। দেখছ, ভেতরটা কেমন লাল? তখন পোন অনেক বেশি সময় ধরে জ্বালানো হতো।”
“জোড়া লাগবে?” তুলির গলা কাঁপছিল।
“লাগবে। বাড়ি গিয়ে বাবা আঠা দিয়ে জুড়ে দেবে। কিন্তু দাগটা থাকবে, মা।”
তুলি মাথা নিচু করল।
নিতাইবাবু হাত বাড়িয়ে তার চিবুকটা একটু তুলে দিলেন, মাটিমাখা আঙুলের একটা হালকা ছাপ পড়ল তুলির গালে। “দাগ থাকা ভালো। দাগ বলে, এই ঘোড়া কারও ঘরে ছিল, কেউ তাকে নিয়ে খেলেছে, কেউ তাকে ভালোবেসেছে। যে ঘোড়ার গায়ে একটাও দাগ নেই, সে তো এখনো দোকানেই দাঁড়িয়ে আছে।”
তারপর তিনি পুঁটিকে ডেকে বললেন, “দিদিকে শেখা।”
* * *
পরের তিন ঘণ্টা আমি উঠোনের এক কোণে মাদুরে বসে চা খেলাম, মুড়ি খেলাম, আর দেখলাম আমার মেয়ে কাদায় ডুবে যাচ্ছে।
পুঁটি শেখাল, ঘোড়া একবারে তৈরি হয় না। পা চারটে আলাদা, চাকায় ঘুরিয়ে ফাঁপা নলের মতো বানানো। গলাটা আলাদা, মুখটা আলাদা, পেটটা আলাদা। তারপর সব জোড়া লাগে, ভেজা মাটি দিয়ে, আঙুল বুলিয়ে বুলিয়ে, যতক্ষণ না জোড়ের দাগ মিলিয়ে যায়। “এই দেখো,” পুঁটি গম্ভীর মুখে বলল, “জোড়া তো সব ঘোড়াতেই আছে। শুধু চোখে পড়ে না।”
তুলির প্রথম পা-টা চাকা থেকে ছিটকে পড়ল উঠোনে। দ্বিতীয়টা হলো বেঁকা, তৃতীয়টা মোটা। নিতাইবাবু চাকা ধরে রাখলেন তার জন্য, নিজের বিশাল হাত দিয়ে তুলির ছোট হাত ঢেকে, আর চতুর্থ পা-টা হলো সোজা আর সুন্দর। তুলি এমন চিৎকার করে উঠল যে একটা মুরগি উড়ে গিয়ে বসল খড়ের চালে।
কান বানানোর সময় এল সবশেষে। পুঁটি দেখাল, দুটো ছোট মাটির পাতা, আঙুলে টিপে টিপে ছুঁচলো করতে হয়, তারপর মাথার দুপাশে বসাতে হয় খাড়া করে, যেন ঘোড়াটা দূরে কারও ডাক শুনছে। তুলির ঘোড়ার একটা কান হলো অন্যটার প্রায় দ্বিগুণ। পুঁটি সেটা ঠিক করতে যাচ্ছিল, তুলি তার হাত ধরে ফেলল।
“থাক,” তুলি বলল। “এটা ওর দাগ।”
নিতাইবাবু শুনে হাসলেন, সারা মুখের ভাঁজ নিয়ে।
কাঁচা ঘোড়া সেদিন বাড়ি আনা গেল না। শুকোতে সময় লাগবে, তারপর পোনে পোড়ানো হবে, পরের সপ্তাহে। নিতাইবাবু কথা দিলেন, পাঠিয়ে দেবেন। তুলি একটা কাঠি দিয়ে ঘোড়ার পেটের নিচে লিখে দিল নিজের নাম। ফেরার পথে সে ট্রেনে আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ল, নখের কোণে তখনো লাল মাটি।
* * *
পার্সেলটা এল এগারো দিন পর। খড়ে মোড়া, দড়ি দিয়ে বাঁধা, একটা পুরোনো মিষ্টির বাক্সে। ভেতরে তুলির ঘোড়া, পোড়ানোর পর গাঢ় লাল, একটু হেলে দাঁড়ানো, একটা কান বিশাল। পেটের নিচে আঁকাবাঁকা অক্ষরে তার নাম। আর বাক্সের তলায়, খড়ের ভেতর থেকে, বেরোল আরেকটা জিনিস: একটা ছোট্ট পোড়ামাটির ঘোড়া, আঙুলের মাপের, গায়ে কাঠি দিয়ে কাটা নকশা। সঙ্গে এক টুকরো কাগজে পেনসিলে লেখা, “তুলিদিদির জন্য। পুঁটি।”
সেদিন রাতে আমি মায়ের ঘোড়ার কানটা জুড়ে দিলাম। খুব সাবধানে, আঠা লাগিয়ে, অনেকক্ষণ আঙুলে চেপে ধরে। জোড়ের জায়গায় একটা সরু রেখা রয়ে গেল, চুলের মতো পাতলা। তুলি টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিল। তারপর নিজের হাঁটু দেখাল, সাইকেল থেকে পড়ে যাওয়ার পুরোনো একটা দাগ।
“ঠাকুমার ঘোড়ারও এখন আমার মতো দাগ হলো,” সে বলল, যেন এর চেয়ে বড় সম্মান আর কিছু হয় না।
শোকেসের সেই তাকে এখন তিনটে ঘোড়া দাঁড়িয়ে থাকে। একটা লম্বা, পুরোনো, কানের গোড়ায় চুলের মতো দাগ। একটা হেলে দাঁড়ানো, এক কান বড়। আর একটা আঙুলের মাপের, যার গায়ে কাঠি দিয়ে কাটা নকশা। বেড়ালটা এখনো মাঝে মাঝে শোকেসের মাথায় ওঠে। তুলি আর ছোটে না। শুধু বলে, “সাবধান, ওখানে আমাদের বাড়ির সবাই আছে।”
আর আমি মাঝে মাঝে রাতে আলো নেভানোর আগে তাকগুলোর দিকে তাকাই, আর ভাবি, পাঁচমুড়ার সেই উঠোনে এখনো হয়তো কোনো বৃদ্ধ চাকা ঘোরাচ্ছেন, কোনো মেয়ের ছোট হাত নিজের হাতে ঢেকে, আর কোথাও কোনো বাড়িতে একটা ঘোড়া খাড়া কান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, দূরে কারও ডাক শোনার অপেক্ষায়।
Bengali · বাংলা
Related stories
ঠোঙায় লেখা নামBengali Short Storyসাবরিনা হোসেন ঊর্মি
কুয়াশার গানBengali Short Storyমৌমিতা বর্মন- ডডালিম কুমার – দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারBengali Classicsদক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
বিষাদ-সিন্ধু: মহরম পর্ব, দ্বাদশ প্রবাহ (অংশ) – মীর মশাররফ হোসেনBengali Classicsমীর মশাররফ হোসেন
বিষাদ-সিন্ধু: মহরম পর্ব, সপ্তম প্রবাহ (অংশ) – মীর মশাররফ হোসেনBengali Classicsমীর মশাররফ হোসেন- ককাঁকণমালা, কাঞ্চনমালা – দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারBengali Classicsদক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার




