পৌষের সকালে ধুবড়ির ঘাটে দাঁড়ালে ব্রহ্মপুত্রকে আর নদী বলে মনে হয় না। মনে হয়, পৃথিবী এখানে এসে শেষ হয়ে গেছে, তারপর শুধু একটা সাদা দেয়াল, নরম, ভেজা, যার ভেতরে হাত ঢোকালে হাত হারিয়ে যায়। রূপা প্রথম দিন সেই দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভেবেছিল, এর ভেতর দিয়ে কেউ রোজ নৌকা চালায় কী করে?
রূপা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকার চাকরি পেয়েছে মাস তিনেক হলো। স্কুলটা একটা চরে, ঘাট থেকে ভটভটিতে চল্লিশ মিনিট। বর্ষায় সেই চরের অর্ধেক জলের নিচে চলে যায়, শীতে আবার জেগে ওঠে বালির পিঠ নিয়ে, তার ওপর সর্ষেখেতের হলুদ, কলাইয়ের সবুজ, আর বাঁশের খুঁটির ওপর টিনের চালের একটা দুই কামরার স্কুল। বাইশজন ছাত্রছাত্রী। তাদের কারও বাবা মাছ ধরে, কারও মা হাঁস পোষে, একজনের দাদু নৌকা বানায়।
আর রোজ সকালে রূপাকে পার করে দেন ইসমাইল চাচা।
চাচার বয়স ষাট ছুঁয়েছে, কিন্তু নৌকার গলুইয়ে দাঁড়ালে তাঁকে দেখায় একটা পুরোনো শালগাছের মতো, শিকড় নৌকার তক্তায় গাঁথা। মাথায় একটা উলের টুপি, কানের ওপর টানা। গলায় মাফলার, সেটা নাকি তাঁর মেয়ের বোনা, রং বলতে আর কিছু বাকি নেই। তিনি কথা কম বলেন। কিন্তু গান করেন। ইঞ্জিনের ভটভট শব্দের নিচে, প্রায় শোনা যায় না এমন গলায়, আপন মনে।
“কী গান চাচা?” রূপা একদিন জিজ্ঞেস করেছিল।
“নদীর গান, দিদিমণি। বাপের কাছে শিখছি। বাপে শিখছে তার বাপের কাছে।” তারপর একটু থেমে, “এই নদীর সঙ্গে কথা কইতে হয়। নাইলে সে রাগ করে।”
রূপা হেসেছিল। ভেবেছিল, বুড়ো মানুষের কথা।
* * *
ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহের এক সকালে কুয়াশা এল অন্যরকম হয়ে। ঘাটে দাঁড়িয়ে রূপা নিজের জুতো দেখতে পাচ্ছিল না ঠিকমতো। ফেরিঘাটের চায়ের দোকানের কেটলি থেকে ধোঁয়া উঠছিল, আর সেই ধোঁয়া কুয়াশায় মিশে যাচ্ছিল এমনভাবে যে কোনটা কোথায় শেষ, বোঝা যায় না। অন্য মাঝিরা সেদিন নৌকা ছাড়েনি। দোকানের বেঞ্চে বসে বিড়ি খাচ্ছিল, আর বলছিল, রোদ না উঠলে যাওয়া যাবে না।
ইসমাইল চাচা আকাশের দিকে একবার তাকালেন, যদিও আকাশ বলে কিছু ছিল না। তারপর বললেন, “চলেন দিদিমণি। আজ পরীক্ষা আছে না বাচ্চাগো?”
ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা। রূপা প্রশ্নপত্রের খামটা বুকে চেপে নৌকায় উঠে বসল।
প্রথম কুড়ি মিনিট সব ঠিক ছিল। ঘাটের আওয়াজ পেছনে মিলিয়ে গেল, তারপর শুধু ইঞ্জিন, আর জলের ছলাৎ ছলাৎ, আর চারদিকে সাদা। রূপার চোখের পাতায়, চুলে, শালের পশমে জমছিল ছোট ছোট জলের দানা। হাত বাড়ালে মনে হচ্ছিল, আঙুলের ডগা থেকে কুয়াশা গড়িয়ে পড়ছে।
তারপর হঠাৎ ইসমাইল চাচা ইঞ্জিন বন্ধ করে দিলেন।
সেই নীরবতাটা রূপা সারাজীবন মনে রাখবে। এমন নিঃশব্দ সে কখনো শোনেনি। নৌকাটা স্রোতে ধীরে ধীরে দুলছিল, কোন দিকে যাচ্ছে বোঝার উপায় নেই। কোথাও একটা পাখি একবার ডাকল, তারপর থেমে গেল। রূপার বুকের ভেতর একটা ঠান্ডা ভয় নড়ে উঠল।
“চাচা?”
“চুপ করেন, দিদিমণি। শুনেন।”
চাচা গলুইয়ে দাঁড়িয়ে, দুই হাত মুখের দুপাশে রেখে, গান ধরলেন। এবার আপন মনে নয়, গলা ছেড়ে, সাদা দেয়ালের ভেতর দিয়ে বহু দূরে পাঠিয়ে দেওয়ার মতো করে:
“ও নদী রে, তোর কূল কোন দিকে, ক’ রে…”
সুরটা কুয়াশায় ঢুকে হারিয়ে গেল। রূপা নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে রইল। এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত। কিছু না।
চাচা আবার গাইলেন। একই লাইন, আরও জোরে।
আর তখন, অনেক দূর থেকে, বাঁ দিকে, প্রায় পেছন থেকে, ভেসে এল একদল সরু, কাঁচা, বেসুরো গলা:
“এই দিকে রে, মাঝি ভাই, এই দিকে আয় রে…”
রূপা চমকে উঠল। গলাগুলো সে চেনে। রোজ সকালে এই গলাগুলোই “দিদিমণি আইছে!” বলে চিৎকার করে।
চাচা একটুও অবাক হলেন না। লগি তুলে নিয়ে নৌকার মুখ ঘোরালেন বাঁ দিকে, ইঞ্জিন চালু না করেই, শুধু লগি ঠেলে। তারপর আবার গাইলেন। আবার উত্তর এল, এবার একটু কাছে, একটু স্পষ্ট। আবার। আবার। প্রতিবার গানের দড়িতে একটা করে গিঁট খুলছে, আর নৌকাটা সেই দড়ি ধরে এগোচ্ছে।
মিনিট দশেক পর কুয়াশার ভেতর থেকে আবছা হয়ে ফুটে উঠল চরের পাড়, একটা নুয়ে পড়া কাশবন, আর পাড়ের ওপর সার বেঁধে দাঁড়ানো বাইশটা ছোট ছায়া। কারও হাতে টিনের থালা, কারও হাতে বালতি, বাজাচ্ছে চামচ দিয়ে। সামনে দাঁড়িয়ে চাচার নাতি মানিক, দ্বিতীয় শ্রেণি, পরীক্ষা দেবে আজ, সবচেয়ে জোরে গাইছে, গলার শিরা ফুলিয়ে।
* * *
নৌকা পাড়ে ভিড়ল। বাচ্চারা ঘিরে ধরল রূপাকে, কেউ তার ব্যাগ নিল, কেউ হাত ধরল। রূপা চাচার দিকে তাকাল।
“এইটা কি রোজকার নিয়ম?”
চাচা টুপিটা খুলে কুয়াশার জল ঝাড়লেন। “কুয়াশার দিনের নিয়ম। আমার বাপের আমলে চরের মাইনষে হারিকেন জ্বালাইত। কুয়াশায় হারিকেন দেখা যায় না, দিদিমণি। গান যায়।” তারপর মানিকের মাথায় হাত রেখে বললেন, “এরা শিখছে পরশু। আপনেরে কয় নাই, আপনে ভয় পাইবেন বইলা।”
সেদিন দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষা হলো দেড় ঘণ্টা দেরিতে। পরীক্ষার পর রূপা বোর্ডে চক দিয়ে লিখল, “ও নদী রে, তোর কূল কোন দিকে, ক’ রে,” আর তার নিচে, “এই দিকে রে, মাঝি ভাই, এই দিকে আয় রে।” বাচ্চারা খাতায় তুলে নিল। মানিক জানাল, গানে আরও লাইন আছে, দাদু সব জানে। পরের দিনগুলোতে চাচা নৌকায় একটু একটু করে বাকি লাইনগুলো বললেন, রূপা ডায়েরিতে লিখে রাখল। কোনো লাইনে নদীর নাম, কোনো লাইনে চরের সর্ষেফুল, কোনো লাইনে এক মাঝির কথা যে ঘরে ফেরে সন্ধ্যার তারা দেখে।
জানুয়ারির মাঝামাঝি একদিন আবার ঘন কুয়াশা নামল। সেদিন ইসমাইল চাচার গলা বসে গিয়েছিল ঠান্ডায়, কথা বলতে গেলে শুধু হাওয়া বেরোয়। মাঝনদীতে ইঞ্জিন বন্ধ করে তিনি অসহায়ভাবে রূপার দিকে তাকালেন।
রূপা উঠে দাঁড়াল। নৌকা দুলে উঠল, সে গলুইয়ের খুঁটি ধরে নিজেকে সামলাল। জীবনে কোনোদিন সে লোকের সামনে গান গায়নি, স্কুলের অনুষ্ঠানেও না। গলা কাঁপছিল। তবু দুই হাত মুখের দুপাশে রেখে সে ডাকল সাদা দেয়ালের দিকে:
“ও নদী রে, তোর কূল কোন দিকে, ক’ রে…”
এক মুহূর্তের নীরবতা। তারপর দূর থেকে, ডান দিক থেকে, বাইশটা গলা একসঙ্গে, আর তাদের মাঝখানে একটা গলা সবচেয়ে উঁচু:
“এই দিকে রে, দিদিমণি, এই দিকে আয় রে…”
ইসমাইল চাচা লগি তুলে নিলেন। তাঁর বসে যাওয়া গলায় কোনো শব্দ হলো না, কিন্তু রূপা দেখল, মাফলারের ভাঁজের ওপরে তাঁর চোখ দুটো হাসছে।
সেদিন রূপা বুঝেছিল, এই নদীর সঙ্গে কথা বলতে হয়। আর নদী উত্তর দেয় মানুষের গলায়।
Bengali · বাংলা
Related stories
কানভাঙা ঘোড়াBengali Short Storyশুভাশিস মজুমদার
ঠোঙায় লেখা নামBengali Short Storyসাবরিনা হোসেন ঊর্মি
টুনটুনি আর বিড়ালের কথা – উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীBengali Classicsউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী- সসুখু আর দুখু – দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারBengali Classicsদক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
আবদুল্লাহ্: নবম পরিচ্ছেদ – কাজী ইমদাদুল হকBengali Classicsকাজী ইমদাদুল হক
আবদুল্লাহ্: চতুর্থ পরিচ্ছেদ – কাজী ইমদাদুল হকBengali Classicsকাজী ইমদাদুল হক





