Skip to main content

The Poetic Land

TYPE AT LEAST 3 CHARACTERS TO SEARCH...

ঠোঙায় লেখা নাম

কাহিনির সারাংশসদরঘাট থেকে বরিশালের রাতের লঞ্চে এক তরুণী শিক্ষিকা বাদামওয়ালা এক কিশোরকে শেখায় নিজের নাম লিখতে, বোনের চিঠির জবাব দেওয়ার জন্য।

সাবরিনা হোসেন ঊর্মি·৬ মিনিটের পাঠ
ঠোঙায় লেখা নাম

সদরঘাটের পাঁচ নম্বর পন্টুনে নাদিয়া যখন এসে দাঁড়াল, বুড়িগঙ্গার ওপর তখন সন্ধ্যা নামছে ধীরে, যেন কেউ জলের গায়ে একটু একটু করে কালি মিশিয়ে দিচ্ছে। চারদিকে হাঁকডাক, “বরিশাল, বরিশাল! কেবিন আছে, ডেক আছে!” কুলিদের মাথায় টিনের ট্রাঙ্ক, কারও হাতে মুরগির খাঁচা, কারও কোলে ঘুমন্ত শিশু। ডিজেলের গন্ধের সঙ্গে মিশে আছে ভাজা বাদাম আর ঝালমুড়ির সর্ষের তেলের ঝাঁজ। লঞ্চের গায়ে টুনি বাল্বের সারি জ্বলে উঠেছে, আর তাদের আলো কাঁপছে কালো জলে।

নাদিয়া ঢাকার একটা স্কুলে বাংলা পড়ায়। বছরে দুবার সে বরিশালে নানির কাছে যায়, আর প্রতিবার লঞ্চে ওঠার আগে এই পন্টুনে খানিক দাঁড়িয়ে থাকে। তার মনে হয়, শহরটা এখানে এসে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে, তারপর মানুষগুলোকে নদীর হাতে তুলে দেয়।

“আপা, বাদাম নিবেন? গরম আছে।”

ছেলেটার বয়স বারো-তেরো হবে। গলায় দড়ি দিয়ে ঝোলানো একটা টিনের থালা, তার ওপর কাগজের ঠোঙায় ভরা বাদাম, মাঝখানে ছোট একটা মাটির মালসায় কয়লা জ্বলছে। জামাটা তার মাপের চেয়ে বড়, হাতা গুটিয়ে কনুই পর্যন্ত তোলা।

নাদিয়া দশ টাকার বাদাম কিনল। ছেলেটা ঠোঙা এগিয়ে দিয়েও চলে গেল না, দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একটু ইতস্তত করে বুকপকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল। কাগজটা এতবার খোলা আর ভাঁজ করা হয়েছে যে ভাঁজের দাগগুলো কাপড়ের মতো নরম হয়ে গেছে।

“আপা, একটু পইড়া দিবেন? আমার বইনে লেখছে। ভোলা থেইকা আইছে, তিন হপ্তা হইল।”

“তিন সপ্তাহ! এতদিন কাউকে দিয়ে পড়াওনি কেন?”

ছেলেটা মাথা চুলকাল। “যার-তার হাতে দিমু না, ভাবছিলাম। আপনারে দেইখা মনে হইল মাস্টারনি।”

নাদিয়া হেসে ফেলল। লঞ্চ ছাড়তে তখনো আধঘণ্টা বাকি। সে রেলিংয়ে হেলান দিয়ে কাগজটা খুলল। অক্ষরগুলো বড় বড়, কোনোটা লাইনের ওপরে উঠে গেছে, কোনোটা নিচে নেমে গেছে, যেন ঢেউয়ের ওপর দুলছে। কোথাও পেনসিলের দাগ ঘষে মুছে আবার লেখা। নাদিয়া পড়তে শুরু করল।

“ভাইয়া, আমি রুমা। এই চিঠি আমি নিজে লিখছি, কেউ হাত ধরে দেয় নাই। আম্মার কাশি এখন কম। পানি নেমে গেছে, উঠানে আবার শুকনা মাটি। লাল মুরগিটা নয়টা বাচ্চা দিছে, একটা কালো। কালোটার নাম রাখছি সুজন, তোমার নামে। রাগ করবা না। স্কুলের আপা বলছে আমি ক্লাসে সবচেয়ে সুন্দর করে নাম লিখি। ভাইয়া, তুমি কি তোমার নাম লিখতে পারো? না পারলে শিখে নিও। তাহলে তুমিও আমারে চিঠি দিতে পারবা। আমি রোজ বিকালে ঘাটে গিয়া লঞ্চ দেখি।”

মুরগির বাচ্চার নাম শুনে সুজন প্রথমে হো হো করে হাসল, পন্টুনের দুজন কুলি পর্যন্ত ফিরে তাকাল। তারপর হঠাৎ চুপ করে গেল। চিঠিটা নাদিয়ার হাত থেকে নিয়ে আবার ভাঁজ করতে লাগল, খুব যত্নে, প্রতিটা ভাঁজ আঙুল দিয়ে চেপে চেপে।

“আমি পারি না,” সে বলল, মাটির দিকে তাকিয়ে। “নাম লেখা।”

ঠিক তখনই লঞ্চের বাঁশি বাজল, লম্বা আর ভারী, বুকের ভেতর পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেওয়া সেই শব্দ। লোকজন হুড়মুড় করে সিঁড়ির দিকে ছুটল। নাদিয়া ব্যাগ কাঁধে তুলে বলল, “তুমি কোথায় যাবে?”

“এই লঞ্চেই তো। রাতে ডেকে বাদাম বেচি, সকালে বরিশাল, আবার রাতে ফিরতি।”

“তাহলে রাতে আমাকে খুঁজে নিয়ো। দোতলার ডেকে, পেছনের দিকে থাকব।”

* * *

লঞ্চ যখন বুড়িগঙ্গা পেরিয়ে খোলা নদীতে পড়ল, শহরের আলো তখন পেছনে একটা হলুদ রেখা মাত্র। ডেক জুড়ে মানুষ বিছানা পেতেছে। কেউ শীতলপাটি বিছিয়েছে, কেউ পুরোনো চাদর। এক কোণে চারজন মিলে লুডু খেলছে, পাশে একটা টিফিন ক্যারিয়ার খুলে কেউ রাতের ভাত খাচ্ছে, শুঁটকির ভর্তার গন্ধ হাওয়ায় ভেসে আসছে। লঞ্চের সার্চলাইট মাঝে মাঝে জলের ওপর সাদা আঙুল বুলিয়ে যায়, আর দূরে জেলে নৌকার হারিকেন জোনাকির মতো দপদপ করে।

সুজন এল রাত দশটার পর, থালা খালি করে। নাদিয়া ততক্ষণে তার ব্যাগ থেকে একটা কলম বের করে রেখেছে। কাগজ ছিল না, তাই সন্ধ্যার সেই খালি ঠোঙাটাই সে খুলে সমান করে নিল। পুরোনো খবরের কাগজের ঠোঙা, এক পাশে কোনো এক সিনেমার বিজ্ঞাপনের অর্ধেক, অন্য পাশে সাদা।

“প্রথমে স,” নাদিয়া বলল। “দেখো, একটা কুঁজওয়ালা মানুষ, মাথায় একটা দাগ টানা।”

সুজন কলমটা এমনভাবে ধরল যেন সেটা একটা জীবন্ত মাছ, পিছলে যাবে। প্রথম স-টা হলো একটা ভাঙা হাঁড়ির মতো। দ্বিতীয়টা একটু ভালো। পঞ্চমটায় নাদিয়া বলল, “এই তো!” আর সুজন এমনভাবে হাসল যেন নদীর ওপারে কেউ তার নাম ধরে ডেকেছে।

উ-কারটা সে সহজে শিখল, বলল ওটা মাছ ধরার বড়শির মতো। জ নিয়ে ঝামেলা হলো। বারবার উল্টো দিকে ঘুরে যায়। নাদিয়া বলল, “জ হলো এক পায়ে দাঁড়ানো বক, ঘাড়টা পেছনে বাঁকানো।” সুজন অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল অক্ষরটার দিকে, তারপর বলল, “আমাগো চরে এমুন বক আছে। সারাদিন খাড়াইয়া থাকে, মাছ ধরে না।” এরপর থেকে তার জ আর ভুল হয়নি।

ন লিখতে লিখতে লঞ্চ মেঘনার মোহনার কাছে এসে পড়ল। বাতাস হঠাৎ ঠান্ডা আর ভেজা হয়ে উঠল, ঢেউ এসে লঞ্চের পেট চাপড়াতে লাগল। কে যেন রেডিওতে পুরোনো গান ছেড়েছে, ভেঙে ভেঙে আসছে সুর। সুজন হাঁটুর ওপর ঠোঙা রেখে, জিভ একটু বের করে, চারটে অক্ষর পাশাপাশি বসাল।

সুজন।

অক্ষরগুলো দেখতে হলো রুমার চিঠির অক্ষরের মতোই, একটু ঢেউ খাওয়া, একটু দুলুনি লাগা। নাদিয়ার মনে হলো, এই দুই ভাইবোনের হাতের লেখা আসলে একটাই নদীর দুই পাড়।

“এইবার রুমা লেখা শিখান,” সুজন বলল। “ওর নামটা আগে।”

রাত একটা পর্যন্ত চলল সেই ক্লাস। ডেকের বাতি কমে এল, চারপাশে মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ, ইঞ্জিনের একটানা গুমগুম। এক সময় নাদিয়া চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। শেষ যে ছবিটা তার চোখে রইল, সেটা হলো রেলিংয়ের পাশে বসে থাকা একটা ছেলে, টর্চের মতো চাঁদের আলোয় একটা কাগজের ঠোঙার ওপর ঝুঁকে আছে।

* * *

সকালে কীর্তনখোলার ওপর হালকা কুয়াশা। বরিশাল ঘাটে লঞ্চ ভিড়ছে, কুলিরা লাফিয়ে উঠছে দড়ি ধরে। নাদিয়া সিঁড়ি দিয়ে নামার জন্য ভিড়ে দাঁড়িয়েছিল, তখন পেছন থেকে কেউ তার ওড়নার কোণ টেনে ধরল।

সুজন। হাতে একটা ঠোঙা, গরম বাদামে ভরা, ধোঁয়া উঠছে।

“আপনার জন্য। ট্যাকা লাগব না।”

নাদিয়া ঠোঙাটা নিল। নিতে গিয়েই দেখল, ঠোঙার গায়ে কলমে লেখা, বড় বড় ঢেউ খাওয়া অক্ষরে:

রুমা। সুজন।

আর তার নিচে, একটু ছোট করে, অনেক কষ্টে লেখা একটা শব্দ, যেটা সে রাতে শেখায়নি। হয়তো সুজন নিজে তার চিঠি থেকে দেখে দেখে তুলেছে:

আপা।

নাদিয়া কিছু বলতে পারল না। গলার কাছে কী যেন আটকে গেল। সে শুধু জিজ্ঞেস করল, “রুমার জন্য লিখবে না?”

সুজন বুকপকেটে হাত দিল। সেখানে আরেকটা ঠোঙা, ভাঁজ করা, চিঠির পাশে। “লেখছি। বাড়ি গেলে নিজের হাতে দিমু।”

নানির বাড়ি যাওয়ার রিকশায় বসে নাদিয়া ঠোঙাটা খুলে বাদামগুলো ব্যাগে ঢেলে নিল, আর কাগজটা সমান করে রেখে দিল তার ডায়েরির ভেতর। বাদামের তেল লেগে কাগজের এক কোণে একটা স্বচ্ছ দাগ হয়েছে, দেখতে অনেকটা নদীর মানচিত্রের মতো। সেই দাগের পাশে তিনটে নাম, তিনজন মানুষ, যারা কাল সন্ধ্যার আগে কেউ কাউকে চিনত না।

রাস্তার পাশে একটা স্কুলের ঘণ্টা বাজছিল। নাদিয়ার মনে হলো, এ বছর সে নিজের ক্লাসের প্রথম দিনে বাচ্চাদের এই গল্পটা বলবে। বলবে, একটা অক্ষরের ভেতরে কত দূরের একটা উঠান লুকিয়ে থাকে, যেখানে একটা মেয়ে রোজ বিকালে ঘাটে গিয়ে লঞ্চ দেখে।

লেখক পরিচিতিসাবরিনা হোসেন ঊর্মি

বরিশালে জন্ম, ঢাকায় থাকেন; পেশায় স্কুলশিক্ষক। ভালোবাসেন লঞ্চের ডেকের রাত আর পুরোনো চিঠি।

গল্পটি ভালো লাগলে ভালোবাসা জানান
Facebook
X
LinkedIn
Threads
WhatsApp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *