আবদুল্লাহ্ যখন শাহ্পাড়ার গোলদার বাড়ী আসিয়া পৌঁছিল, তখন বেলা প্রায় দ্বিপ্রহর। সংবাদ পাইয়া গৃহস্বামী কাসেম গোলদার ব্যস্ত-সমস্ত হইয়া ছুটিয়া আসিল এবং তাহার দীর্ঘ শুভ্র শ্মশ্রুরাজি ভূলুণ্ঠিত করিয়া আবদুল্লার ‘কদমবুসি’ করিতে উদ্যত হইল! এ ধরনের অভিনন্দনের জন্য আবদুল্লাহ্ একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। পথে হঠাৎ সাপ দেখিলে মানুষ যেমন এক লম্ফে হটিয়া দাঁড়ায়, সেও তেমনি হটিয়া গিয়া বলিয়া উঠিল, “আহা, করেন কি, করেন কি, গোলদার সাহেব।”
কাসেম গোলদার বড়ই সরলপ্রাণ, ধর্মপরায়ণ, পীরভক্ত লোক। আবদুল্লার পিতা তাহার পীর ছিলেন; এক্ষণে তাঁহার মৃত্যুতে আবদুল্লাহ্ তাঁহার স্থলাভিষিক্ত বলিয়া মনে করিয়া লইয়া সে আবদুল্লার ‘কদমবুসি’ করিবার জন্য নত মস্তকে হাত বাড়াইয়াছিল। কিন্তু আবদুল্লাহ্ পা টানিয়া লওয়ায় সে উহা স্পর্শ করিতে পাইল না; তাহার মনে হইল বেহেশতের দুয়ারের চাবি তাহার হাতের কাছ দিয়া সরিয়া গেল। বড়ই মর্মপীড়া পাইয়া রুদ্ধ কণ্ঠে কাসেম কহিতে লাগিল, “আমাদের কি পায়ে ঠেললেন, হুজুর! আমরা আপনাদের কত পুরুষের মুরীদ! আপনার কেবলা সাহেব তাঁর এই গোলামের উপর বড়ই মেহেরবান ছিলেন; আপনি আমাদের পায়ে না রাখলে কি উপায় হবে, হুজুর!”
কাসেমের মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করিয়া আবদুল্লাহ্ বড়ই অপ্রস্তুত হইয়া গেল। চিরদিনের সংস্কার বশে যে ব্যক্তি তাহাকে পূর্ব হইতেই পীরের পদে প্রতিষ্ঠিত করিয়া রাখিয়াছে এবং আজ সরল বিশ্বাসে প্রাণের ঐকান্তিক ভক্তি ও শ্রদ্ধা অঞ্জলি ভরিয়া নিবেদন করিবার জন্য উন্মুখ হইয়া দাঁড়াইয়া আছে, আবদুল্লার এই অপ্রত্যাশিত প্রত্যাখ্যান যে সে ব্যক্তির প্রাণে গুরুতর আঘাত দিবে ইহা আর বিচিত্র কি! কিন্তু উপায় নাই। এ আঘাত অনেককেই দিতে হইবে এবং অনেকবার তাহাকে এইরূপ অপ্রীতিকর অবস্থার সম্মুখীন হইতে হইবে।
আবদুল্লাহ্ কহিল, “অমন কথা বলবেন না, গোলদার সাহেব। আমার বাপ-দাদা সকলেই পীর ছিলেন মানি, কিন্তু আমি ত তাঁদের মত পীর হবার যোগ্য হইনি। ও-কাজটা আমার দ্বারা কোন মতেই হবে না। তা ছাড়া আপনি বৃদ্ধ, সুতরাং আমার মুরুব্বী; এ ক্ষেত্রে আমারই উচিত আপনার “কদমবুসি করা।”
কাসেম শিহরিয়া উঠিয়া দাঁতে জিভ কাটিয়া কহিল, “আরে বাপ্ বাপ্! এমন কথা ব’লে আমাকে গোনাহ্ গার করবেন না, হুজুর! যে বংশে খোদা আপনাকে পয়দা করেছেন, তার এক বিন্দু রক্ত যাঁর গায়ে আছে, তিনিই আমাদের পীর, আমাদের মাথার মণি! আপনাদের পায়ের একটুখানি ধূলো পেলেই আমাদের আখেরাতের পথ খোলাসা হয়ে যায়, হুজুর!
আবদুল্লাহ্ একটুখানি হাসিয়া কহিল, “খোদা না করুন যেন আখেরাতের পথ খোলাসা ক’রবার জন্যে কাউকে আমার মত লোকের পায়ের ধূলো নিতে হয়! তা যাকগে, এখন আমি যে এতটা পথ হেঁটে হয়রান হয়ে এলাম, আমাকে একটু বিশ্রাম করতে দিতে হবে, সে কথা কি ভুলে গেলেন গোলদার সাহেব?”
কাসেমের চৈতন্য হইল। তাই ত! এতক্ষণ সে কথাটা যে তাহার খেয়ালেই আসে নাই। তখনই, “ওরে বিছানাটা পেতে দে, পানি আন্, তৈল আন্, গোসলের যোগাড় কর” ইত্যাকার সোরগোল পড়িয়া গেল। আবদুল্লাহ যখন মুরশিদের প্রাপ্য ভক্তি-নিদর্শনগুলি গ্রহণ করিয়া কাসেমের মনের বাসনা পূর্ণ করিতে অস্বীকার করিল, তখন সে অন্ততঃ মেহ্মানদারী বাবদে সে ত্রুটি ষোল আনা সংশোধন করিয়া লইতে চেষ্টা করিল। সময়াভাবে এ-বেলা কেবল মোরগের গোশত এবং মুগের ডা’ল প্রভৃতির দ্বারা কোন প্রকারে মেহ্মানের মান রক্ষা হইল বটে, কিন্তু রাতের জন্য বড় এক জোড়া খাশীর এবং সেই উপলক্ষে গ্রামের প্রধান ব্যক্তিগণকেও দা’ওৎ করিবার বন্দোবস্ত হইয়া গেল।
এদিকে বেলা প্রায় তিন প্রহরের সময় আহারাদি সম্পন্ন করিয়া যখন আবদুল্লাহ্ কাসেম গোলদারকে ডাকিয়া কহিল যে, আর বিলম্ব করিলে চলিবে না, তাহাকে এখনই রওয়ানা হইতে হইবে, নহিলে সন্ধ্যার পূর্বে একবালপুরে পৌঁছিতে পারিবে না, তখন কাসেমের মাথায় যেন আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল। সে হাত দুটী যোড় করিয়া এমনই কাতর মিনতিপূর্ণ দৃষ্টি তাহার মুখের উপর স্থাপন করিল যে, বেচারা বুড়া মানুষের মনে দ্বিতীয়বার দুঃখ দিতে আবদুল্লার মন সরিল না। সুতরাং সে সেখানেই সেদিনকার মত রাত্রিবাস করিতে রাজি হইয়া গেল। আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া কাসেম তৎক্ষণাৎ কোমর বাঁধিয়া যথারীতি আয়োজনে লাগিয়া পড়িল।
সারাটা বৈকাল এবং রাত্রি এক প্রহর ধরিয়া লোকজনের আনাগোনা চীৎকার, বালক-বালিকাগণের গণ্ডগোল এবং ডেগ্চি কাফগীরের ঘনসঙ্ঘাতে গোলদার-বাড়ী মুখরিত হইতে লাগিল। এই বিরাট ব্যাপার দেখিয়া আবদুল্লাহ, ভাবিতে লাগিল, মুসলমান সমাজে পীর-মুরশিদের সম্ভ্রম ও মর্যাদা কত উচ্চ। গোলদারেরা না হয় সঙ্গতিপন্ন গৃহস্থ; ইহাদের পক্ষে মুরশিদের অভ্যর্থনার জন্য অম্লানবদনে অর্থব্যয় করা অসম্ভব না হইতে পারে। কিন্তু নিতান্ত দরিদ্র যে, সে-ও তাহার বহু যত্নপালিত খাশী-মূরগীর মায়া গৃহাগত মুরশিদের সেবায় উৎসর্গ করিয়া এবং মহাজনের নিকট হইতে উচ্চ হারের সুদে গৃহীত ঋণের শেষ টাকাটী সালামী স্বরূপ তাঁহার চরণপ্রান্তে ফেলিয়া দিয়া বেহেশতের পাথেয় সঞ্চয় হইল ভাবিয়া আপনাকে ধন্য মনে করে।
রাত্রে আহারাদির পর কাসেম কয়েক জন মাতব্বর লোক লইয়া এক মজলিস বসাইল এবং তাহাদের এই একমাত্র পীর-বংশধর যে পৈতৃক ব্যবসায় পরিত্যাগ করিয়া হতভাগ্য মুরীদগণের পারত্রিক কল্যাণ সম্বন্ধে একেবারে উদাসীন হইয়া পড়িয়াছেন ইহাই লইয়া নানা ছন্দোবন্ধে দুঃখ প্রকাশ করিতে আরম্ভ করিল। এই পীরগোষ্ঠী যে কত বড় কেরামতকুশল, সমাগত লোকদিগকে তাহা বুঝাইবার জন্য সে আবদুল্লার পূর্বপুরুষগণের বিষয়ে অনেক গল্প বলিতে লাগিল।
প্রথম যিনি আরব হইতে পীরগঞ্জে আসেন —সে কত কালের কথা, তাহার ঠিকানা নাই;—তিনি প্রকাণ্ড এক মাছে চড়িয়া সাগর পার হইয়াছিলেন; তাই তাঁহাকে সকলে ‘মাহী সওয়ার’ বলিত। তিনি কত বড় পীর ছিলেন, তাঁহার “দস্ত-মোবারকের” স্পর্শমাত্রেই কেমন করিয়া:মরণাপন্ন রোগীও বাঁচিয়া উঠিত, ঘরে বসিয়াই তিনি কেমন করিয়া বহুক্রোশ দূরবর্তী নদীবক্ষে মজ্জমান নৌকা টানিয়া তুলিয়া ফেলিতেন এবং সেই ব্যাপারে কিরূপে তাঁহার আস্তিন ভিজিয়া যাইত, আকাশে হাত তুলিয়া “আও—আও” বলিয়া ডাকিতেই কোথা হইতে হাজার হাজার কবুতর আসিয়া জুটিত এবং তিনি হাত নাড়িয়া কি প্রকারে আস্তিনের ভিতর হইতে রাশি রাশি ধান, ছোলা, মটর প্রভৃতি বাহির করিয়া তাহাদিগকে খাওয়াইতেন, সে সকল ঘটনা সালঙ্কারে বর্ণন করিয়া কাসেম সকলকে স্তম্ভিত ও চমৎকৃত করিয়া দিল। আবার শুধু তিনিই যে একলা পীর ছিলেন, এমত নহে, তাঁহার বংশেও অনেক বড় বড় পীর জন্মিয়া গিয়াছেন; এমন কি, কেহ কেহ শিশুকালেই এমন আশ্চর্য কেরামত দেখাইয়াছেন যে, তাহা ভাবিলেও অবাক্ হইতে হয়। ‘মাহী সওয়ার’ পীর সাহেবের পৌত্র কিংবা প্রপৌত্রের একটা বড় আদরের কাঁঠাল গাছ ছিল। একবার তাহাতে একটামাত্র কাঁঠাল ফলিয়াছিল, সেটা তিনি নিজে খাইবেন বলিয়া ঠিক করিয়া রাখিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার অনুপস্থিতকালে তাঁহার এক বালক পুত্র ঐ কাঁঠাল পাড়িয়া খাইয়া ফেলেন। বাটী আসিয়া পীর সাহেব যখন দেখিলেন যে গাছে কাঁঠাল নাই, তখন তিনি বড়ই রাগান্বিত হইয়া সকলকে জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন, কে উহা খাইয়াছে। সকলেই জানিত, কিন্তু ভয়ে কেহ বলিল না। অবশেষে তিনি পুত্রের বিমাতার নিকট জানিতে পারিলেন কাহার এই কাজ। তখন পুত্রের তলব হইল; কিন্তু তিনি অস্বীকার করিলেন এবং কহিলেন, “কেন; বাপ-জান, কেহ ত সে কাঠাল খায় নাই, গাছের কাঁঠাল গাছেই আছে!”
তাহার পর পীর সাহেব গিয়া দেখেন সত্যসত্যই গাছের কাঁঠাল গাছেই ঝুলিতেছে! দেখিয়া ত তিনি অবাক্ হইয়া গেলেন, কিন্তু ব্যাপার কি, তাহা বুঝিতে বাকী রহিল না। তখন তাঁহার বড় গোস্বা হইল; তিনি বলিলেন, “কেয়া এক ঘরমে দো পীর! যাও বাচ্চা, সো রহো।” সেই যে বাচ্চা গিয়া শুইয়া রহিলেন, আর উঠিলেন না!
আবদুল্লাহ্ নিতান্ত নিরুপায় হইয়া বসিয়া বসিয়া কাসেমের এই সরল বিশ্বাসের উচ্ছ্বাস-রঞ্জিত উপাখ্যানগুলি জীর্ণ করিতেছিল। ক্রমে রাত্রি অধিক হইয়া চলিল দেখিয়া অবশেষে মজলিস ভঙ্গ করিয়া সকলে উঠিয়া গেল। অতঃপর আবদুল্লাহ্ শুইয়া শুইয়া ভাবিতে লাগিল, পুত্রের পীরত্বে পিতার হৃদয়ে এরূপ সাংঘাতিক হিংসার উদ্রেক আরোপ করিয়া ইহারা পীর-মাহাত্ম্যের কি অদ্ভুত আদর্শ ই মনে মনে গড়িয়া তুলিয়াছে!
Bengali · বাংলা
Related stories
আলোকে – কামিনী রায়Bengali Classicsকামিনী রায়
থাম্ অশ্রু থাম্ – কামিনী রায়Bengali Classicsকামিনী রায়
কাচের শিশি ও মে’টে সরা – রজনীকান্ত সেনBengali Classicsরজনীকান্ত সেন
বিষাদ-সিন্ধু: মহরম পর্ব, নবম প্রবাহ (অংশ) – মীর মশাররফ হোসেনBengali Classicsমীর মশাররফ হোসেন
অবরোধ-বাসিনী: সাত – রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনBengali Classicsরোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
আবদুল্লাহ্: নবম পরিচ্ছেদ – কাজী ইমদাদুল হকBengali Classicsকাজী ইমদাদুল হক





