Skip to main content

The Poetic Land

TYPE AT LEAST 3 CHARACTERS TO SEARCH...
বাংলা প্রবন্ধইতিহাস

ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বাংলার স্বর: নিম্ন অসমের না-বলা কথা

ধুবড়ি থেকে বরপেটা, ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের বাংলাভাষী মানুষের ইতিহাস, গান, নদীর জীবন আর ভাষার মর্যাদার আকাঙ্ক্ষার কথা।

শামীম আয়ান·৬ মিনিটের পাঠ
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বাংলার স্বর: নিম্ন অসমের না-বলা কথা
ছবি: যোগমায়া ঘাট, ধুবড়ি, Anup Sadi, Wikimedia Commons, CC BY-SA 4.0

আমি ধুবড়ির মানুষ। আমার শৈশব কেটেছে ব্রহ্মপুত্রের হাওয়ায়, নৌকার পালে, চরের বালিতে। আমি অসমীয়ায় লিখি, অসমীয়াকে ভালোবাসি। আবার আমার চারপাশের অগণিত মানুষের ঘরে, হাটে, মাঠে যে ভাষা বাজে, সেটি বাংলা। এই লেখা তাঁদের জন্য, ধুবড়ি, দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর, গোয়ালপাড়া, বঙ্গাইগাঁও আর বরপেটার সেই বাংলাভাষী মানুষদের জন্য, যাঁদের কথা বাংলা ভাষার বড় আলোচনায় খুব কমই ওঠে।

ইতিহাসের শিকড়

এই অঞ্চল বাংলার কাছে নতুন নয়। ঔপনিবেশিক আমলে অবিভক্ত গোয়ালপাড়া জেলা ছিল বাংলা প্রেসিডেন্সির অংশ। ১৮৭৪ সালে আসামকে আলাদা চিফ কমিশনারের প্রদেশ করা হলে গোয়ালপাড়া, কাছাড় ও শ্রীহট্ট বাংলা থেকে নতুন প্রদেশে যুক্ত হয়। ধুবড়ি তখন এই গোয়ালপাড়া জেলারই শহর।

বিশ শতকের গোড়া থেকে, বিশেষ করে ১৯০১-১৯১১ দশকে, পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ, রংপুর, পাবনা, বগুড়ার মতো জেলা থেকে বহু কৃষক পরিবার ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় আসেন। ১৯১১ সালের জনগণনায় তাঁদের প্রথম দেখা যায় গোয়ালপাড়ার চরে। তাঁরা নদীর বুকে জেগে ওঠা চর আর নিচু জমিতে চাষ শুরু করেন। সেই ঘামের ফসলেই আজকের চর-চাপোরির জীবন।

সংখ্যার হিসাব, আর হিসাবের বাইরে

আমি সংখ্যা দিয়ে কথা বলতে চাই, কারণ সত্যই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ২০১১ সালের ভারতীয় জনগণনার মাতৃভাষা সারণি (C-16) অনুযায়ী:

  • বরপেটা: ৬১.৭% মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। এখানে বাংলাভাষীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
  • বঙ্গাইগাঁও: ৪৩.৪% বাংলা, ৪৮.৫% অসমীয়া। প্রায় সমান সমান।
  • দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর (২০১১ সালে ধুবড়ির অংশ, এই দুই রাজস্ব চক্রের হিসাবে): প্রায় ৩৯% বাংলা।
  • গোয়ালপাড়া: ২৮.৯% বাংলা।
  • ধুবড়ি (তখনকার অবিভক্ত জেলা): ২৪.৮% বাংলা; রাজবংশী ইত্যাদি মিলিয়ে বাংলা-গোষ্ঠী ২৯.৬%।

তবে এই সরকারি হিসাব মাঠের ছবির সঙ্গে মেলে না। স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও বেসরকারি অনুমান বলে, ধুবড়িতে বাংলাভাষী (গোয়ালপাড়িয়া বা রংপুরী-সহ) মানুষ ৯০ শতাংশেরও বেশি, আর মানকাচরে প্রায় ৯৯ শতাংশ; গোয়ালপাড়া, বঙ্গাইগাঁও আর বরপেটার অনেক এলাকাতেও ছবিটা একই রকম। এগুলো সরকারি পরিসংখ্যান নয়, কিন্তু আমার চোখে দেখা বাস্তব। এর একটি বড় কারণ, এখানকার গোয়ালপাড়িয়া কথ্য ভাষা আসলে রংপুরী ভাষারই রূপ, যা বাংলার নিকট আত্মীয়; অথচ জনগণনায় অনেকে তা অসমীয়া বা অন্য ভাষা হিসেবে লেখান।

কাগজের এই সংখ্যা আমাদের চোখে দেখা বাস্তবের চেয়ে কম কেন? কারণ মাতৃভাষা আসলে মানুষের নিজের ঘোষণা। ১৯৫১ সালের জনগণনায় পূর্ববঙ্গ থেকে আসা বহু পরিবার মাতৃভাষা হিসেবে অসমীয়া লিখিয়েছিলেন; তাতে আসামে অসমীয়াভাষীর হার ১৯৩১ সালের ৩১% থেকে বেড়ে ৫৬.৭%-এ পৌঁছায়। আজও এঁদের অনেকে নিজেদের “না-অসমীয়া” বলেন, অসমীয়া মাধ্যমে পড়েন, অসমীয়ায় কবিতা লেখেন। সে পরিচয়ও শ্রদ্ধার। আবার ঘরের ভাষা হয়ে থাকে বাংলার কাছাকাছি এক কথ্য রূপ।

এই দ্বিধা নতুন নয়। ১৯২১ সালের জনগণনা প্রতিবেদনে এক প্রাক্তন চিফ কমিশনারের কথা উদ্ধৃত আছে: গোয়ালপাড়ার মানুষ সবাই “গোয়ালপাড়ী” বলেন; বাংলার দিকে তাতে বাংলার ছোঁয়া, আসামের দিকে অসমীয়ার ছোঁয়া, আর মাঝখানে দুটোরই। ভাষাবিদ জর্জ গ্রিয়ারসনের ভারতের ভাষা-সমীক্ষাতেও বলা হয়েছিল, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম গোয়ালপাড়ার ভাষা রাজবংশী, যা বাংলারই এক উপভাষা, আর পূর্ব দিকে তা ধীরে ধীরে অসমীয়ার সঙ্গে মিশে যায়। আমার কাছে এটাই এই মাটির আসল ছবি: দুই ভাষার সেতু, কোনো দেয়াল নয়।

গানের দেশ, নদীর দেশ

এই অঞ্চলের প্রাণ তার গান। গোয়ালপাড়িয়া লোকগীতে ভাওয়াইয়া আর চটকা প্রধান ধারা, সঙ্গে দোতরার সুর। ভাওয়াইয়া এক ভাগ করা ঐতিহ্য: বাংলাদেশের রংপুর, পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার আর অবিভক্ত গোয়ালপাড়া, তিন জায়গারই গান। বাংলাদেশে এই গানকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ। মাহুতের দূরে চলে যাওয়া, বিরহ আর অপেক্ষা এই গানের চিরকালের সুর। গৌরীপুরের প্রতিমা বড়ুয়া পাণ্ডে এই গানকে সারা দেশে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালে গৌরীপুরে ড. ভূপেন হাজরিকা তাঁর গান শুনে তাঁকে উৎসাহ দেন। অসমীয়া আর বাংলা, দুই সংস্কৃতির ভালোবাসাতেই এই গান বেঁচে আছে।

আর আছে নদী। ধুবড়িকে বলা হয় “নদীর দেশ”, তিন দিকে ব্রহ্মপুত্র আর গঙ্গাধর। ব্রিটিশ আমলে ধুবড়ির নদীবন্দর ছিল ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র; এখান থেকে পাট আর চাল জলপথে কলকাতায় যেত। চরের মানুষের জীবন আজও নৌকা, মাছ ধরা, চাষ আর বন্যার সঙ্গে লড়াইয়ের জীবন। প্রতি বছর নদী জমি ভাঙে, নতুন চর জাগায়; মানুষ আবার ঘর বাঁধে। এই অদম্য জেদই আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

সম্প্রীতির শহর

ধুবড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে নেতাই ধুবুনির কিংবদন্তি। লোককথায় তিনি দেবতাদের কাপড় কাচতেন, আর মনসামঙ্গলের বেহুলাকে স্বর্গে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিলেন; লোকমুখে শহরের নামও তাঁর সঙ্গে যুক্ত। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে আজও নেতাই ধুবুনি ঘাট আছে। একই শহরে শ্রী গুরু তেগ বাহাদুর সাহিব গুরুদ্বারা, যেখানে কথিত আছে গুরু নানক এসেছিলেন এবং পরে নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর সপ্তদশ শতকে এই গুরুদ্বারা প্রতিষ্ঠা করেন। কাছেই পাঁচপীরের দরগা, আর বগরিবাড়ির মহামায়া ধাম। মন্দির, দরগা আর গুরুদ্বারা এখানে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে।

আমার আবেদন

আমি কারও বিরুদ্ধে কিছু বলছি না। অসমীয়া আমার ভাষা, আমার গর্ব। আমি শুধু চাই, এই অঞ্চলে যাঁরা বাংলাকে মাতৃভাষা বলে জানেন, তাঁদের ভাষা আর সংস্কৃতিও স্বীকৃতি পাক, মর্যাদা পাক। বাংলা ভাষার মানচিত্রে বরাক উপত্যকা আর ত্রিপুরার কথা যেমন আসে, তেমনি আসুক ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের এই মানুষদের কথাও। আর প্রত্যেক মানুষ নিজের মাতৃভাষা নিজে বেছে নিন, নির্ভয়ে, সম্মানের সঙ্গে।

আশার কথা

ব্রহ্মপুত্র কোনো একটি ভাষার নদী নয়। তার জলে অসমীয়া বিহুগীত আর বাংলা ভাওয়াইয়া একসঙ্গে ভেসে যায়। দুই ভাষাই এই মাটিকে সমৃদ্ধ করেছে, আর করবে। আমি স্বপ্ন দেখি এমন এক দিনের, যেদিন ধুবড়ির কোনো শিশু গর্ব করে বলবে, “আমি বাংলায় স্বপ্ন দেখি, অসমীয়ায় গান গাই, আর এই নদী আমাদের সবার।” সেই দিনের জন্যই এই লেখা।

উৎস

  1. Census of India 2011, Table C-16 (Population by Mother Tongue), Assam: censusindia.gov.in (DDW-C16-STMT-MDDS-1800.XLSX)
  2. Wikipedia: Dhubri district, Goalpara district, Bongaigaon district, Barpeta district, South Salmara-Mankachar district (ভাষা অংশ, C-16 উদ্ধৃত)
  3. J.B. Bhattacharjee, “The First Partition of Bengal (1874)”, 2005 (JSTOR 44145915); Wikipedia: British rule in Assam
  4. Census of India 1921, Vol. III Assam, Part I (G.T. Lloyd), ভাষা অধ্যায় (archive.org: in.gov.ignca.31059)
  5. Wikipedia: Goalpariya dialects; Academia.edu / ResearchGate: “Redrawing frontiers: Language, resistance and the imagining of a Goalparia people”; “State, Language Contestations, and Borderlands: The Case of Dhubri”
  6. Census of India 1931 ও 1951 (আসাম); Wikipedia: Assamese language (ভাষাভাষী পরিসংখ্যান); Frontline, “Migrants and beyond”
  7. Wikipedia: Goalpariya Lokgeet (B. Dutta 1995); Bhawaiya (Banglapedia); Pratima Barua Pandey
  8. Wikipedia: Dhubri; Dhubri Port; India Today NE (নেতাই ধুবুনি, ধুবড়ির নোঙর আবিষ্কার, ২০২৪)
  9. Wikipedia: Gurdwara Sri Guru Tegh Bahadur Sahib; gurudwaradhubrisahib.com; dhubri.assam.gov.in (মহামায়া ধাম)
লেখক পরিচিতিশামীম আয়ান

শামীম আয়ান আসামের ধুবড়ি জেলার দক্ষিণ শালমারার মানুষ। অসমীয়া ও বাংলা, দুই ভাষাতেই লেখেন। তাঁর লেখায় উঠে আসে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের মানুষ, ভাষা আর সংস্কৃতির কথা।

লেখাটি ভালো লাগলে ভালোবাসা জানান
Facebook
X
LinkedIn
Threads
WhatsApp

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *