শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভাসতে শুরু করলেই কলকাতার মানুষ টের পান, পুজো আসছে। দুর্গাপূজা হিন্দু দেবী দুর্গার আরাধনা, কিন্তু কলকাতায় এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি শিল্প, সংগীত, খাবার আর মানুষের মিলনের এক বিশাল উৎসব।
নদীর মাটি, শিল্পীর হাত
পুজোর কয়েক মাস আগে থেকেই ছোট ছোট কারখানায় শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ। উত্তর কলকাতার কুমোরটুলি এই কাজের সবচেয়ে পরিচিত পাড়া, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে শিল্পীরা মাটির মূর্তি গড়ে আসছেন। প্রতিমা তৈরি হয় গঙ্গার মাটি দিয়ে, না-পোড়ানো মাটিতে। দেবী দুর্গার সঙ্গে থাকেন তাঁর সন্তানেরা, আর থাকে মহিষাসুর।
মহালয়ার দিন থেকে উৎসবের আবহ শুরু হয়। প্রচলিত বিশ্বাসে এই দিনে প্রতিমার চোখ আঁকা হয়, যেন মাটির মূর্তিতে প্রাণ আসে। এখন ভিড়ের কারণে অনেক মণ্ডপ মহালয়া থেকেই দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। মূল পুজোর দিনগুলো হলো ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী আর বিজয়া দশমী। দশমীতে প্রতিমা আবার সেই নদীতেই বিসর্জন দেওয়া হয়, যেখান থেকে মাটি এসেছিল। তাই দুর্গাপূজা অনেকের কাছে ঘরে ফেরার উৎসবও।
কলকাতায় পুজো হয় দুই রকম ভাবে। একদিকে পুরোনো পরিবারের ঘরোয়া পুজো, যাকে অনেকে বনেদি বাড়ির পুজো বলেন; অন্যদিকে পাড়া বা আবাসনের সবাই মিলে চাঁদা তুলে করা সর্বজনীন বা বারোয়ারি পুজো। এই সর্বজনীন পুজোই উৎসবটাকে সত্যিকারের জনগণের উৎসবে পরিণত করেছে। পুজোকে ঘিরে লোকসংগীত, রান্নাবান্না, হস্তশিল্প আর নানা পরিবেশনা শিল্পও প্রাণ পায়; পুজোর মৌসুম তাই অসংখ্য শিল্পী আর কারিগরের রুজিরও মৌসুম।
শহরজোড়া শিল্পের প্রদর্শনী
কলকাতার পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ প্যান্ডেল বা মণ্ডপ। কোনোটি পুরোনো মন্দিরের আদলে, কোনোটি একেবারে নতুন ভাবনার স্থাপনা। আলোকসজ্জা, প্রতিমার গড়ন, মণ্ডপের নকশা মিলে গোটা শহর যেন একটা খোলা প্রদর্শনী হয়ে ওঠে। ঢাকের বাজনা, ধুনুচি, ভিড়ের মধ্যে রাত জেগে ঠাকুর দেখা, এসব মিলিয়েই কলকাতার পুজোর চেনা ছবি। এই কয়েকটা দিন শ্রেণি, ধর্ম, জাতির ভেদাভেদ অনেকটাই মুছে যায়; সবাই একসঙ্গে হাঁটেন, দেখেন, আনন্দ ভাগ করে নেন।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউনেস্কো “কলকাতার দুর্গাপূজা”কে মানবতার অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এই স্বীকৃতিতে প্রতিমাশিল্পী, নকশাকার, আয়োজক থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শনার্থী, সবার ভূমিকাকেই সম্মান জানানো হয়েছে।
কলকাতার বাইরে
কলকাতা দুর্গাপূজার সবচেয়ে বড় কেন্দ্র হলেও উৎসবটি শুধু একটি শহরের নয়। পশ্চিমবঙ্গের বাইরে ত্রিপুরা, আসাম, ঝাড়খণ্ডসহ ভারতের নানা জায়গায় এবং বিশ্বের নানা শহরে বাঙালিরা দুর্গাপূজা করেন। বাংলাদেশেও এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব; ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ সারা দেশের মণ্ডপে ঢাকের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে শরৎ।
বিজয়ার দিনে বিদায়ের বিষণ্ণতা থাকে, কিন্তু সঙ্গে থাকে আশ্বাস: আসছে বছর আবার হবে। মাটি থেকে প্রতিমা, প্রতিমা থেকে আবার মাটি, এই চক্রের মধ্যেই লুকিয়ে আছে দুর্গাপূজার গভীর সৌন্দর্য।
Bengali · বাংলা
Related articles
সুন্দরবন: দুই দেশের এক অরণ্যBengali Articlesশাহনাজ পারভীন লিপি
জামদানি, নকশিকাঁথা ও শীতলপাটি: বাংলার হাতের জাদুBengali Articlesরুমানা আফরোজ ঐশী
বাগেরহাট, পাহাড়পুর ও বিষ্ণুপুর: পোড়ামাটি আর ইটের ইতিহাসBengali Articlesঅনির্বাণ দেবনাথ
উনিশে মে, ১৯৬১: বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনBengali Articlesঅয়ন দত্তরায়
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বাংলার স্বর: নিম্ন অসমের না-বলা কথাBengali Articles
পহেলা বৈশাখ: হালখাতা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রাBengali Articlesফারহানা ইসলাম মিতু






