গ্রামের মেঠোপথে গেরুয়া বা সাদা পোশাকে এক মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন, হাতে একতারা, গলায় গান। বাংলার মানুষের কাছে এই ছবি অচেনা নয়। তিনি বাউল। কোনো মঠের পুরোহিত নন, কোনো দরবারের শিল্পীও নন; তাঁর সাধনা গান, আর সেই গানের বিষয় মানুষ।
বাউল কারা
বাউলরা বাংলার মরমি গায়ক-সাধক। তাঁদের বাস মূলত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে। কেউ গ্রামের পাশে আখড়া বেঁধে থাকেন, কেউ এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে জীবন চালান। সঙ্গে থাকে একতারা, দোতারা, ছোট ঢোল বা ডুগডুগি।
বাউল ভাবনায় হিন্দু ভক্তি আন্দোলন, বৈষ্ণব সহজিয়া ধারা, বৌদ্ধ চিন্তা আর সুফি মরমিবাদের ছাপ আছে, তবু বাউলরা নিজেদের কোনো প্রতিষ্ঠিত ধর্মের অংশ মনে করেন না। জাতপাত, নির্দিষ্ট দেবতা, মন্দির বা তীর্থস্থান তাঁদের কাছে মুখ্য নয়। তাঁদের বিশ্বাস, মানুষের দেহই সেই ঘর, যেখানে পরম সত্যের বাস। তাই বাউল গানে বারবার ফিরে আসে “মনের মানুষ” খোঁজার কথা, গুরুর প্রতি ভক্তির কথা।
এই গান ও জীবনধারা বাংলার সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তা ও গানেও বাউলদের প্রভাব স্পষ্ট; তিনি দেশে-বিদেশে বক্তৃতায় বাউল দর্শনের কথা বলেছেন। ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানকে মানবতার মৌখিক ও অধরা ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে, আর ২০০৮ সালে এটি অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় যুক্ত হয়।
ছেঁউড়িয়ার সাধক লালন
বাউল গানের কথা উঠলে সবার আগে যাঁর নাম আসে, তিনি লালন সাঁই, যাঁকে লালন শাহ বা লালন ফকির নামেও ডাকা হয়। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নিশ্চিত তথ্য কম, জন্মস্থান নিয়েও নানা মত আছে। জানা যায়, কৈশোরে বা যৌবনে তীর্থযাত্রার পথে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, এবং সেই সময় সিরাজ সাঁই নামে এক সাধকের সংস্পর্শে আসেন। পরে সিরাজ সাঁইকেই তিনি গুরু হিসেবে গ্রহণ করেন।
লালনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। তবু তাঁর গানে হিন্দু ও মুসলমান দুই ধর্মের দর্শন সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের ছাপ পাওয়া যায়। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় কালীগঙ্গা নদীর ধারে তিনি আখড়া গড়ে তোলেন, আর সেখানেই শিষ্যদের নিয়ে সাধনা ও গানে জীবন কাটান। তাঁর গানে বারবার উঠে এসেছে জাতপাতের প্রশ্ন; মানুষ কোন জাতের, এই প্রশ্নকেই তিনি অর্থহীন বলেছেন। “খাঁচার ভিতর অচিন পাখি” বা “বাড়ির কাছে আরশিনগর”-এর মতো গান আজও সমান জনপ্রিয়।
লালন নিজের গান লিখে রেখে যাননি; শিষ্যদের মুখে মুখে সেগুলো ছড়িয়েছে। ঠাকুর পরিবারের জমিদারির এলাকায় তাঁর বাস ছিল, আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা একটি স্কেচই তাঁর জীবদ্দশার একমাত্র ছবি হিসেবে পরিচিত। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়াতেই তাঁর মৃত্যু হয়, সেখানেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।
আজকের আখড়া
প্রতি বছর দোলপূর্ণিমায় আর লালনের মৃত্যুবার্ষিকীতে অক্টোবর মাসে ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় হাজারো ভক্ত, বাউল আর ফকির জড়ো হন। কয়েক দিন ধরে চলে গান আর সাধুসঙ্গ। সেখানে গেলে বোঝা যায়, দুশো বছরেরও আগে জন্ম নেওয়া এক সাধকের প্রশ্নগুলো আজও কতটা জীবন্ত: মানুষ কে, তার পরিচয় কী, আর ভালোবাসার চেয়ে বড় ধর্ম কী হতে পারে।
Bengali · বাংলা
Related articles
কলকাতার দুর্গাপূজা: মাটির প্রতিমা থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যBengali Articlesঋতম চক্রবর্তী
একুশে ফেব্রুয়ারি: এক দেশের শোক, সারা পৃথিবীর মাতৃভাষা দিবসBengali Articlesনীলিমা হাসনাত
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বাংলার স্বর: নিম্ন অসমের না-বলা কথাBengali Articles
পহেলা বৈশাখ: হালখাতা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রাBengali Articlesফারহানা ইসলাম মিতু
সুন্দরবন: দুই দেশের এক অরণ্যBengali Articlesশাহনাজ পারভীন লিপি
জামদানি, নকশিকাঁথা ও শীতলপাটি: বাংলার হাতের জাদুBengali Articlesরুমানা আফরোজ ঐশী






