বাংলার পলিমাটির দেশে পাহাড় কম, পাথর আরও কম। তাই এখানকার কারিগরেরা বহু শতাব্দী ধরে ভরসা করেছেন হাতের কাছের উপকরণে: মাটি, যা আগুনে পুড়িয়ে হয় ইট আর টেরাকোটা বা পোড়ামাটির ফলক। বৌদ্ধ বিহার, সুলতানি আমলের মসজিদ, মল্ল রাজাদের মন্দির, তিন ভিন্ন যুগের তিন ভিন্ন বিশ্বাসের স্থাপত্যে এই একই মাটির গল্প।
পাহাড়পুর: সোমপুর মহাবিহার
বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে এক বিশাল বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ, যার নাম সোমপুর মহাবিহার। প্রত্নতাত্ত্বিক সিলমোহর থেকে জানা যায়, পাল বংশের রাজা ধর্মপাল এটি নির্মাণ করিয়েছিলেন, অষ্টম শতকের শেষ দিকে। বর্গাকার বিহারের চারপাশ ঘিরে আছে ভিক্ষুদের থাকার ১৭৭টি কক্ষ, আর মাঝখানে উঁচু ধাপে ধাপে ওঠা কেন্দ্রীয় মন্দির।
মন্দিরের দেয়ালে সারি সারি পোড়ামাটির ফলক, তাতে মানুষ, পশুপাখি, লোকজীবনের নানা দৃশ্য। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত মহাযান বৌদ্ধধর্মের এক নামকরা জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল এই বিহার। ইউনেস্কোর মতে, এর স্থাপত্যরীতির প্রভাব পৌঁছেছিল সুদূর কম্বোডিয়া পর্যন্ত। ১৯৮৫ সালে পাহাড়পুরের বিহার বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।
বাগেরহাট: মসজিদের শহর
সুন্দরবনের কাছাকাছি খুলনা অঞ্চলের বাগেরহাটে পঞ্চদশ শতকে উলুঘ খান জাহান একটি শহর গড়ে তোলেন, যার পুরোনো নাম খলিফাতাবাদ। পথঘাট, জলাধার আর অসংখ্য মসজিদ মিলিয়ে শহরটির পরিকল্পনায় সে যুগের প্রকৌশল দক্ষতার ছাপ স্পষ্ট। এখানকার স্থাপনাগুলোর বেশির ভাগই পোড়া ইটে তৈরি।
সবচেয়ে বিখ্যাত ষাট গম্বুজ মসজিদ। নামে ষাট হলেও এর মূল ছাদে গম্বুজ আছে সাতাত্তরটি, আর ভেতরে ছাদ ধরে রেখেছে ষাটটি স্তম্ভ। নামটা হয়তো সেই স্তম্ভ থেকেই এসেছে, এমন ব্যাখ্যাও প্রচলিত। ১৯৮৫ সালে “মসজিদের শহর বাগেরহাট” ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত হয়।
বিষ্ণুপুর: পোড়ামাটির মন্দিরনগরী
সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর ছিল মল্ল রাজাদের রাজধানী। বৈষ্ণব মল্ল রাজারা সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে এখানে একের পর এক মন্দির গড়েছেন, ইট আর ল্যাটেরাইট পাথরে। মন্দিরের দেয়ালজুড়ে শত শত পোড়ামাটির ফলকে রামায়ণ আর মহাভারতের নানা কাহিনি।
এখানকার রাসমঞ্চ এক অনন্য স্থাপনা। ১৬০০ সালে রাজা বীর হাম্বির এটি তৈরি করান। ল্যাটেরাইটের উঁচু ভিতের ওপর পিরামিডের মতো ছাদ, আর গর্ভগৃহ ঘিরে তিন সারি প্রদক্ষিণপথ। রাস উৎসবে শহরের রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ এখানে এনে রাখা হতো। বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলো ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্ভাব্য (টেনটেটিভ) তালিকায় রয়েছে।
পাহাড়পুরের বৌদ্ধ ভিক্ষু, বাগেরহাটের সুলতানি স্থপতি আর বিষ্ণুপুরের মল্ল কারিগর, কেউ কাউকে চিনতেন না। তবু তাঁদের হাতে একই বাংলার মাটি নতুন নতুন রূপ পেয়েছে। দুই দেশের এই তিনটি জায়গা ঘুরে এলে বোঝা যায়, বাংলার ইতিহাস লেখা আছে ইটের গায়েও।
Bengali · বাংলা
Related articles
বাউল গান ও লালন: একতারার সুরে মানুষের খোঁজBengali Articlesশুভ্রজিৎ পাল
কলকাতার দুর্গাপূজা: মাটির প্রতিমা থেকে বিশ্ব ঐতিহ্যBengali Articlesঋতম চক্রবর্তী
সুন্দরবন: দুই দেশের এক অরণ্যBengali Articlesশাহনাজ পারভীন লিপি
একুশে ফেব্রুয়ারি: এক দেশের শোক, সারা পৃথিবীর মাতৃভাষা দিবসBengali Articlesনীলিমা হাসনাত
জামদানি, নকশিকাঁথা ও শীতলপাটি: বাংলার হাতের জাদুBengali Articlesরুমানা আফরোজ ঐশী
পহেলা বৈশাখ: হালখাতা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রাBengali Articlesফারহানা ইসলাম মিতু






