প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঢাকার আকাশে একটা গান যেন আপনিই বাজতে থাকে। খালি পায়ে, হাতে ফুল নিয়ে মানুষ হেঁটে যায় শহীদ মিনারের দিকে। কিন্তু এই দিনটির শুরু উৎসব হিসেবে নয়, শুরু একটি প্রশ্ন থেকে: একটি দেশের মানুষ কোন ভাষায় কথা বলবে, লিখবে, রাষ্ট্রের কাজ চালাবে?
প্রশ্নটা উঠেছিল ১৯৪৮ সালেই
দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা। তবু রাষ্ট্রভাষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় ১৯৪৮ সালেই। সে বছর পাকিস্তানের গণপরিষদে সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রস্তাব করেন, পরিষদে বাংলাতেও কথা বলার ও কাজ চালানোর অধিকার থাকুক। প্রস্তাবটি গৃহীত হয়নি, কিন্তু প্রশ্নটা আর থামেনি। ছাত্র, শিক্ষক, লেখক থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে একটা দাবিতে এক হলেন: বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে হবে।
একুশের দুপুর
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। সমাবেশ ঠেকাতে সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে, অর্থাৎ জমায়েত নিষিদ্ধ। ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ছাত্ররা সেই নিষেধ অমান্য করে জড়ো হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে, যা তখন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পাশেই ছিল। মিছিল আইন পরিষদ ভবনের দিকে এগোতে চাইলে পুলিশ গুলি চালায়। শহীদ হন রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত, আবদুস সালামসহ আরও অনেকে।
শোক থেকেই জন্ম নিল স্মৃতির স্থাপত্য। ঘটনার পরপরই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা রাত জেগে গুলির জায়গায় একটি ছোট স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তোলেন। কয়েক দিনের মধ্যেই পুলিশ সেটি ভেঙে দেয়, কিন্তু স্মৃতি ভাঙা যায়নি। পরে শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশায় তৈরি হয় আজকের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, মেডিক্যাল কলেজের কাছেই।
আন্দোলন বৃথা যায়নি। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। তারপর থেকে প্রতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের স্মরণে পালিত হয়ে আসছে।
একুশের স্মৃতি এখন শুধু একটি দিনে আটকে নেই। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে ঢাকায় বসে অমর একুশে বইমেলা, যার শুরু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে আয়োজিত এই মেলা আজ বাংলা বই, লেখক আর পাঠকের সবচেয়ে বড় মিলনমেলাগুলোর একটি। নতুন বইয়ের গন্ধ আর ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হয়, একুশের শহীদেরা যে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, সেই ভাষা আজ কতটা প্রাণবন্ত।
ঢাকা থেকে সারা পৃথিবী
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এই দিনটি পৌঁছে যায় বিশ্বসভায়। বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলন ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও এই ঘোষণাকে স্বাগত জানায়, আর ২০০৮ সালকে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক ভাষা বর্ষ হিসেবে।
আজ এই দিনে কোথাও কেউ বাংলায় কবিতা পড়ে, কেউ নিজের আদিবাসী ভাষায় গান গায়, কেউ হয়তো প্রথমবার মায়ের ভাষায় নিজের নাম লেখে। একুশের মূল কথা এটাই: কোনো ভাষাই ছোট নয়। বাংলার বাইরেও এই চেতনার আরেকটি অধ্যায় আছে; আসামের বরাক উপত্যকায় ১৯৬১ সালের ১৯ মে-র ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মাতৃভাষার লড়াই সীমান্ত মানে না।
শহীদ মিনারের সিঁড়িতে রাখা ফুলগুলো তাই শুধু অতীতের জন্য নয়। সেগুলো প্রতিটি মানুষের সেই সহজ অধিকারের জন্য, নিজের ভাষায় ভাবতে পারার, বলতে পারার অধিকার।
Bengali · বাংলা
Related articles
সুন্দরবন: দুই দেশের এক অরণ্যBengali Articlesশাহনাজ পারভীন লিপি
ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে বাংলার স্বর: নিম্ন অসমের না-বলা কথাBengali Articles
বাউল গান ও লালন: একতারার সুরে মানুষের খোঁজBengali Articlesশুভ্রজিৎ পাল
বাগেরহাট, পাহাড়পুর ও বিষ্ণুপুর: পোড়ামাটি আর ইটের ইতিহাসBengali Articlesঅনির্বাণ দেবনাথ
পহেলা বৈশাখ: হালখাতা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রাBengali Articlesফারহানা ইসলাম মিতু
জামদানি, নকশিকাঁথা ও শীতলপাটি: বাংলার হাতের জাদুBengali Articlesরুমানা আফরোজ ঐশী






